স্কুলে আমার এক বন্ধুকে স্যার উড়নচণ্ডী বললে সে অভিধান ঘেঁটে এর অর্থটা বের করল, তারপর তাঁকে বলল ‘যার কানাকড়ির সম্বল নেই, সে কীভাবে অমিতব্যয়ী হয় স্যার?’ স্যার হেসে বলেছিলেন, ‘জীবনযাপনটাও হিসাবের ব্যাপারে, সেখানে তোর ঘাটতি আছে। তোকে দেখলে মনে হয় একটা কাটাঘুড়ি। কাটাঘুড়ির কি কোনো গন্তব্য থাকে?’সোহেল মোস্তাকের উড়নচণ্ডী ছেলেটা নিজেকে গোছাতে চেয়েছিল কবিতাগ্রন্থের পাণ্ডুলিপিটি পড়ে আমার মনে হয়েছে, নিজেকে যে গোছাতে পারে, সে উড়নচণ্ডী হতে পারে না। কাটাঘুড়ি কোনো দিন নাটাইয়ের খোঁজ পায় না―যদি পায়, তাহলে ঘুড়ি হিসেবে তার মর্যাদা বাড়ে না।
কবিতাগুলো পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, যে উড়নচণ্ডীকে সোহেল তার কবিতার মাঝখানে রেখেছেন, এ সময়ের মানুষগুলোর ভেতর সে কিছুটা হলেও থাকলে দেশটা অনেক সুন্দর হতো; হিসাবের খেরোখাতা হাতে ছুটতে থাকা লোকজনের হঠাৎ কাটাঘুড়ির কথা মনে পড়ত, তারা হয়তো একটু থমকে গিয়ে ভাবত, শেষ স্টেশনের মতো নাম-ঠিকানাসর্বস্ব একটা গন্তব্যের কি খুব প্রয়োজন? সোহেলের উড়নচণ্ডীর পিছুটান নেই, আফসোস নেই, দুঃখবোধ নেই; সে মঞ্চ ছেড়ে মঞ্চেই পড়ে থাকে, সংসার তাকে টানে না, এক জীবনের সব জায়গায় সে জিততেও চায় না।
এই উড়নচণ্ডী এক সংবেদী মানুষ, প্রেমিকও, ঘরবাড়ি ছেড়ে সে প্রেমিকার কাছাকাছি ‘বহু দূরে’ বসে থাকে, অথচ প্রেমিকাকে না পেলেও প্রেমটাকে সে বিশুদ্ধ একটা অনুভব ভেবে তৃপ্তিও পায়। আমি নিশ্চিত সোহেলের কবিতার পাঠকরা এই উড়নচণ্ডীকে ভালোবাসবেন, ‘যে অকারণে কাঁদে, হাসে, গান গায়,/পাগল একটা মাঝে মাঝে লিখেও...,/তার সামনে ইকারুসের আকাশ,/প্রমিথিউসের আলোর মিছিল।’এই উড়নচণ্ডী কবি নিজেও। উড়নচণ্ডী ছেলেটা নিজেকে গোছাতে চেয়েছিলর কবিতাগুলো জীবন নিয়ে, প্রেম ও অপ্রেম নিয়ে এবং কবিতা নিয়েও। সোহেল মোস্তাকের ভাবটা গভীর, ভাষাটা অজটিল; তার বিষয়ভাবনায় বৈচিত্র্য আছে, প্রকাশে স্পষ্টতা আছে। তার চিত্রকল্পগুলো অনেক সময় জীবন্ত ছবির মতো। আমার সেই বন্ধু যে রকম ভেবেছিল, উড়নচণ্ডী মানেই বেহিসেবি, সোহেল তা অপ্রমাণ করেছেন। তার কবিতায় নির্মাণের, নন্দনের, ভাবনার, কল্পনার কোনো অঞ্চলেই বেহিসেবি বলে কিছু নেই। এসব ব্যাপারে সোহেল খুব যতœশীল। শুধু যে চিন্তাটি, যে দর্শনটি তিনি তার পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নেন, তা জীবনকে কাটাঘুড়ির গন্তব্যহীন ভেসে বেড়ানোর, ভালোবাসার, কোনো পিছুটান ছাড়া টেনে নেওয়ার আনন্দের।
Title উড়নচণ্ডী ছেলেটা নিজেকে গোছাতে চেয়েছিল
Author সোহেল মোস্তাক
Publisher সাহিত্যদেশ
ISBN 9789848069172
Edition 1st Published, 2021
Number of Pages 64
Country বাংলাদেশ
Language বাংলা
Login To Comment